“বেবাইল্যা অইলে হোআইল্যে অয়”: স্বাধীনতার স্বাধীনতা!

0
7

“বেবাইল্যা অইলে হোআইল্যে অয়”: স্বাধীনতার স্বাধীনতা!

স্বাধীনতা কি শুধুই স্বাধীন দেশে বসবাস করা? সম্ভবত, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জাজেক রুশো বলেছেন, ‘Man is born free, but everywhere he is in chains”. স্বাধীনতা যেমন স্বেচ্ছাচারিতা নয়, তেমনি উদার বাঁধহীন জীবনযাত্রাও নয়, বৈ কী!
নিয়মের বেড়াজালে থেকে মানুষ নাগরিক হিসেবে তার জীবনযাপন প্রায়ই শৃঙ্খলিত করে ফেলেছে!

প্রকৃত স্বাধীনতা কিসে? চিন্তা, কর্ম ও বাক্যের সমন্বয়ে যদি মানুষের পরিধি হয়, তাহলে বলা যায়, রাষ্ট্র শুধু মাত্র কর্মের, ক্ষেত্রবিশেষে বাক্যের নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু চিন্তাধারার উপর তেমন শৃঙ্খল কি পড়ানো যায়?
মুক্ত চিন্তা। অবাঁধ ভাবনা।
রবি ঠাকুরের ভাষায়,
‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। /
তব অবগুন্ঠিত কুন্ঠিত জীবনে
কোরো না বিড়ম্বিত তারে।
আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো,..”

কিংবা নজরুলের ভাষায়
‘আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল! /আমি মানি না কো কোন আইন,”
বা ‘আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা,/ করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পান্জা, অথবা শামসুর রাহমানের ভাষায়,
‘যেমন ইচ্ছা লেখার আমার কবিতার খাতা’…
মুক্তচিন্তার গলাটা অনেকসময় বন্ধ করে দেয়া হয়, যদি সমসাময়িক সময়ে কারো বৈষয়িক স্বার্থে হানা হয় অাঘাত-প্রতিঘাত! কিন্তু ভাবনারাশি বা চিন্তার পরিধি যখন বৈষয়িক সংকির্ণতার স্তর পারি দিয়ে প্রকৃতি, স্রষ্টা, ত্রিভূবনের সীমাহীন জগতে অবাধ বিচরণ করার যাত্রীর কি কোন শত্রু আছে?
হ্যা, আছে কয়েকটি।
সুকান্ত যেমন বলেছেন,
“হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন কঠোর গদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক
গদ্যের করা হাতুড়িকে আজ হানো।
প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা-
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়ঃ … ”

Robert Frost ও থমকে দাঁড়ায়,
“But i have promises to keep
And miles to.go before I sleep”.

Andrew Marvell যেটাকে বলেন, “At my back, I always hear
Time’s winged chariot hurrying near”
কবি WH Davies এর ভাষায় “What’s life, if full of care, we have no time to stand and stare”.
William Wordsworth যেন সেজন্যই বলেছেন, “The world’s too much with us”.

কতদিন হয়েছে, আপনি খোলা মাঠে চিৎ হয়ে শুয়ে বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে রোদে ঝলসানো চোখের উপর হাত রেখে মাটির গন্ধে আন্দোলিত ছিলেন?
কখনো কি টিনের চালে বৃষ্টির ছন্দ বোকার মত উপভোগ করেছেন?
কখনো কি ঝর্ণার নান্দনিক সৌন্দর্য, মনভোলানো শব্দের ঝংকার উপভোগ করার জন্য ছড়ার কন্ঠকময় মাইলের অধিক পথ মাড়িয়েছেন?

কখনো কি শীতের ভোরে খোলা মাঠে খড়-কুটা দিয়ে আগুনের কুন্ডলী তৈরি করে অনেকে মিলে শীত নিবারণ করেছেন?
কখনো কি নবান্নোত্তর মাঠে দুরন্ত বাছুর বা ছাগলছানার দৌড়ানোকে পেছনে ফেলতে ছুটেছেন অনেকক্ষণ?
কখনো কি শুধুমাত্র একটা কবিতার পংক্তির শব্দ মেলানোর নেশায় রাতজেগে ভোর দেখেছেন?
কখনো কি বন্ধুদের সাথে আড্ডায় গোধুলীবেলায় মশার কামড় উপেক্ষা করে বিকেলকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যাকে রাতে পরিণত করেছেন, শুধু দু’টাকার বাদাম খেয়ে?
কখনো কি পাহাড়ের চূড়ায় বসে নিচের দিকে তাকিয়ে ভেবেছেন, অনেক মানুষ আপনার সমান হতে কিবা আপনার উচ্চতায় উঠতে কতই না কষ্ট করছেন?

কখনো কি শুধু সাগরের বেলাভূমিতে বসে ঘড়ির ঘন্টা ভুলে সহস্র ঢেউয়ের আঘাতে নিজের দুঃখকে জলাঞ্জলি দিতে পেরেছেন বা চেষ্টা করেছেন?

কিংবা, নিজের সময় ও অর্থ দিয়ে এমন কারো পাশে দাঁড়িয়েছেন, যার কাছ থেকে কোনদিন কিছু পাওয়ার সুযোগ নেই?
অন্ধ অসহায়, বধির প্রতিবেশি, পঙ্গু স্বজন, রোগাক্রান্ত পথিক, অভুক্ত দুঃস্থ, কপর্দকহীন ভিক্ষুককে দেখে কখনো কি সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজের স্বাস্থ্য, সম্পদ, সচ্ছলতার জন্য কৃতজ্ঞচিত্তে চোখের জল ফেলে বলেছেন?
‘হে করুনাময়,
‘আমারে তুমি অশেষ করেছো.’…

তেমন অচতুর কিংবা বোকার মত ভাবনা যদি না-ই থাকে, তৃপ্তি-পরিতৃপ্তির ঢেউ যদি অন্তরসাগরে না-ই থাকে, সে জীবনে পরম উপভোগ কই?
শুধু না পাওয়ার হতাশা, অতৃপ্তির ঢেকুর, ঊনচেষ্টার ফসলে যদি অসন্তোষ দানা বাঁধে হৃদয়ে, সব নদী হারাবে স্রোত, সরবে বা নিরবে….

Lord Tennyson এর ভাষায় অনেককে বলতে শুনিনা, বা বেশিরভাগই বলেনা,
‘One equal temper of heroic hearts,
Made weak by time and fate, but strong in will
To strive, to seek, to find, and not to yield.”

ভাবের এ অবাধ স্বাধীনতা, স্বেচ্ছাচারিতার অভাবে সমাজ-দেহের বিভিন্ন অঙ্গ আজ ব্যাধিগ্রস্ত। ভাবনার খোলা আকাশ যখন কথিত প্রযুক্তি, সৃষ্ট সভ্যতাযন্ত্র কিংবা বৈষয়িক তাড়নার যাঁতাকলে পিষ্ট, তখন প্রকৃত ‘ঐশ্বর্য’ অনেকদূর…

গ্রামবাংলার ভঙ্গুর অর্থনীতির যুগে জীবন জীবিকার তাগিদে অনেকে গ্রাম থেকে শহরে, রেঙ্গুম>রেঙ্গুন (মায়ানমারের বর্তমান নগর ইয়াঙ্গুন) এ, পাকিস্তানের করাচি বা ভারতের কোলকাতায় যেতেন অপেক্ষাকৃত সাহসী যুবকগণ। অনেকে সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক চাকুরী, জাহাজে বা অন্য কোন ব্যবসার সুযোগ পেতেন; দেশে আসতেন অর্থনৈতিক প্রাচুর্য লাভের পর। টেলিযোগাযোগ বা অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতায় তখন টেলিগ্রাফ ছাড়া অন্য কোন পন্থায় পরিবারের পক্ষ থেকে নিয়মিত খবরও পাওয়া যেত না! দেশান্তরি (আঞ্চলিক ভাষায় ‘বেবাইল্যা’) এসব সাহসী লোকেরা দৃশ্যমান উন্নতিসহ দেশে ফিরে আসলে প্রতিবেশিগণ তখন বলতো,
“বেবাইল্যা হলে হোআইল্যে হয়” (দেশান্তরি হলে ভাগ্যবান হয়)..

এ ‘বেবাইল্যে’ হওয়া নিরুদ্দেশ হওয়া নয়, নয় জীবনের প্রতি escapist মনোভাব বা বৈরাগ্যে আস্বাদন, বরং এ ছুটে চলায় ছিলো উদ্যম, চ্যালেঞ্জ বা সাহসিকতা।

আজ চিন্তা আর ভাবের কৃত্রিম সীমাবদ্ধতা, সংকীর্ণতা দেখে জানতে ইচ্ছা করে, আজও কি কেউ আছে, যে ‘বেবাইল্যা’ হয়ে প্রকৃত ‘হোআইল্যে’ হয়, পৌঁছে অবাঁধ ভাবনার দূর দিগন্তে, মুক্তমনের রংধনুতে???

Fortune favors the brave….

—-
মোঃ নাজিম উদ্দিন
২৩ আগষ্ট, ২০১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here