বাংকু ও সেকালের গ্রীষ্ম বিকাল

0
0

বাংকু ও সেকালের গ্রীষ্ম বিকাল

ইট পাথরের এ যুগে আমি মাঝে মাঝে ভাবি, এক বিরল শৈশবে কেটে আমাদের দিনগুলি: আজকের রঙিন দিনের তুলনায় এ যেন এক সাদাকালো দিনাতিপাত।
তখনকার সেসব শৈশব ছিলো বিদ্যুৎবিহীন দিন। অবশ্য সে স্মৃতি বেশিদিন স্থায়ী ছিলোনা; তবে শিল্পীর ভাষায় বলতে পারি, “যা পেয়েছি, তা কম কিছু নয়”..
আমাদের স্বভাবই যেন, যা হারিয়ে যায়, তার প্রতি তীক্ষ্মদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, যা নেই, তা-ই পাওয়ার জন্য হাহাকার। সংকটময় অভাব, অপ্রতুলতার, পশ্চাদপদ সেসবব দিনও যেন ফিরে পেতে চায় এ মন বারেবার।
কেমন ছিলো সেসব দিন? এ প্রশ্নের উত্তর বেশ দীর্ঘ। কোথা থেকে শুরু করি, তা-ই ভাবি। সকালে মক্তব, তারপর স্কুল, তার পর পুকুরে দুরন্তপনায় কাটতো গ্রীষ্ম। পুকুরে মাঝখানে চিৎ হয়ে মুখটা সূূর্যের দিকে দিয়ে যেন পানির বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা- যেন এই তো সেদিনের কথা। গোসল, খাবার শেষে অর্থাৎ ভর দুপুরে আমাদের জোর করে ঘুম পারাতো আমাদের দাদা, বাবা, মায়েরা। তবে গ্রীষ্মের প্রখরতায় বিদ্যুৎ আর বৈদ্যুতিক পাখা বিহীন দিনে সম্বল ছিলো হাতপাখা। কতক্ষণ আর তাল পাতার সে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে ঘুম আনা যায়?

গরমে অতিষ্ট হয়ে এক সময় বের হয়ে পড়তাম। দক্ষিণ ঘাটা বলে বাদামতলের সেই ছায়া সুনিবিড় স্থানটি ছিলো সবার পছন্দের। দক্ষিণ বিলে থেকে আসতো বাতাস। দু চার বাড়ি থেকে অনেকে চলে আসতো দুপুরের প্রচন্ড গরমে নিজেদের সামলে নিতে; এসে কেউ খোশ গল্প করতেন, কেউ মঙ্গল পাঠান, বাঘ পাইর খেলতেন, কেউ আবার পড়নের শার্ট খুলে দু আড়াই ফুট চওড়া বাংকু (বাঁশের তৈরি বিশেষ ঘাটসদৃশ বিছানা বা চৌকি) -তে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন কোন ফাঁকে!
আমাদের এ দৃশ্য মানাতোনা। কখনো তাল পাতার খেলনার পাখা, কখনো পাতার বাঁশি বাজানো, কখনো বা খেলার মধ্যে কাটতো দুপুর।
বিকেলে খেলার মাঠ জমজমাট। তখনো মাঠে খেলার সুযোগ দিতো না বড়রা। শুধু দর্শক হয়ে থাকতে হতো। তবে কোন দিন বড়দেন কয়েকজন একসাথে অনুপস্থিত থাকলে সুযোগ মিলতো খেলার। খেলার পর আবার সান্ধ্যকালীন গোসল: ভাবটা ছিলো এমন যেন অনেক কাজ করে এসে কত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা গোসল করতে পুকুর ঘাট দখল করে আছে!

ওদিকে ঘরে পৌঁছলে কত বিচার সালিশ! পড়াশুনা। খাবার। ঘুম।
তবে খুব গরমে আবারো হাতপাখা ব্যর্থ হলে আমাদের দাদা বাবারা ছুটে যেতেন পুকুর ঘাটে বা সে-ই বাংকুতে। গভীর রাতে বাতাসের স্নিগ্ধতা যেন সুশীতল স্পর্শে হাত বুলিয়ে দিতো আমাদের হিয়া! আহা! সে কী সুখক্ষণ!
হাতে ঘড়ি থাকলে মানৃষ অনেকটা শৃঙ্খলিত হয়ে যায়। তখর হাতে তো নয়ি, বরং ঘরেও অনেকের ঘড়ি ছিলোনা! তাই কত গভীর রাতে বাড়ু ফিরছি কিংবা রাত কতক্ষণ হয়েছে- এনিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে হতোনা সেসব স্বাধীন বেলায়।
কত রাতে বাড়ি ফিরবো, পথে কোন সমস্যা হবে কি না, ঘরে চোর ঢুকবে কি না- এ সবের ভয়েও ভীত ছিলোনা সেসব দিনে! সেসব রাতে!

এ যেন বাঁধাধরা বর্তমান জীবনের তুলনায় একখন্ড অবাধ স্বাধীনতা; এ যেন খাঁচায় বন্দি পাখপাখালির বন্দিক্ষণে খোলা দিগন্তে অবাধে ছুটে চলার সেসব সুখস্মৃতির জাবর কাঁটা!

মোঃ নাজিম উদ্দিন
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here