জ্ঞানের আকাশের উজ্জ্বল তারকা, আলোর দিশারিঃ

2
2

জ্ঞানের আকাশের উজ্জ্বল তারকা, আলোর দিশারিঃ

লেখকঃ অধ্যাপক শামসুল আনোয়ার জামাল Anwar Jamal

—————–

২০২১ সাল দুটি বিশেষ কারণে আমাদের জাতীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেলো। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী এবং দেশের প্রথম ও প্রধান উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে পদার্পণ। আজ “প্রথম আলো ” পত্রিকায় প্রাক্তন শিক্ষার্থী জনাব পিয়াস মজিদ ” এ জি স্টকের স্মৃতিময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ” শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। পৃষ্ঠার শুরুতে অনেক পুরনো অথচ পরিষ্কার সাদাকালো একটি আলোকচিত্র ছাপা হয়েছে। একটু কষ্ট করে দেখলে সবাইকে না হলেও অনেককেই চেনা যায়। ছবির মধ্যখানে তৎকালীন ইংরেজি বিভাগের সভাপতি য়্যমী জেরাল্ডিন স্টক ( এ জি স্টক) তাঁর সহকর্মী শিক্ষকবৃন্দ ও কয়েকজন কৃতি শিক্ষার্থী। ছবির দ্বিতীয় লাইনের বাম থেকে চতুর্থ ছবিটি আমার প্রিয় জন্মস্থান, চট্টগ্রামের রাউজানের মোহাম্মদ পুর গ্রামের কৃতি সন্তান অধ্যক্ষ শামসুদ্দিন মুহাম্মদ ইসহাক সাহেবের। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন কৃতি ছাত্র, এবং কুমিল্লার জনাব হাবিবুল্লাহ খান, ও বরিশালের জনাব এ জেড এম ওবায়দুল্লাহ খানের ব্যচম্যাট ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের (এস এম হল) রুমমেট ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণালি ইতিহাসের অংশ হওয়া মোহাম্মদ পুর গ্রাম ও স্কুলের জন্য প্রথম ঘটনা নয়। ১৯২১ সালে স্থাপিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম ব্যাচের একজন কৃতি ছাত্রও এই রত্নপ্রসবিনী মোহাম্মদ পুরের কৃতি সন্তান। সুফি সাধক, আধ্যাত্মিক পুরুষ, জীবন্ত কিংবদন্তী অধ্যাপক আবদুল জলিল মোহাম্মদ মহিউল ইসলাম। ছবিতে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, হাবিবউল্লাহ খান, পাশাপাশি সৈয়দ আলী আহসান ও মুনির চৌধুরীকে স্পষ্ট করে চেনা যায়।

মিসেস এ জি স্টকের অসাধারণ স্মৃতি চারণের মাধ্যমে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাজ্ঞসর পুর্ব বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশের চমৎকার চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি কবি জসিম উদ্দিন, মুনির চৌধুরী, খান সরোয়ার মুর্শিদ, উপাচার্য মাহমুদ হোসেন এমনকি তাঁর বাসার গৃহকর্মী আবদুলের কথাও বলতে ভুলেন নি। বৃটিশ আমলে যোগ দিয়ে, পাকিস্তান আমল শেষ করে দীর্ঘদিন পর স্বাধীন বাংলাদেশে পুনরায় তিনি ভিজিটিং প্রফেসর হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার তিনটি ভিন্ন সময় ও রাজনৈতিক মেরুকরণের ঐতিহাসিক সাক্ষী হয়ে আছেন।

অক্সফোর্ড থেকে পি এইচ ডি করা মিসেস স্টক সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাংলা মুলুকে এসেছিলেন। তাঁর স্মৃতিতে তিনটি ভিন্ন সময়ের বর্ননায় আবহমান বাংলার চিরায়ত চরিত্র, ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠান, সীমিত সংখ্যায় হলেও নারীদের উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ, সংগ্রামের অংশীদার অথচ পারিবারিক আবহে প্রথাবিরোধী হতে না পারা সহ অনেক বিষয় উঠে এসেছে, যা আমাকে আপ্লুত করেছে, এই মহিয়সী মহিলার প্রতি জানার আগ্রহ জাগিয়েছে।

শুরু করেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণালি অতীতে আমার গ্রামের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে। আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার সুযোগ পাইনি,কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অনেকেই আমার আপন জন ও বন্ধু। তাঁদের কৃতিত্ব ও সাফল্য আমাদের ছুয়ে যায়। শতবর্ষ আগে আধ্যাত্মিক সাধক অধ্যাপক আবদুল জলিল মোহাম্মদ মহিউল ইসলামের মাধ্যমে শুরু হয়ে ক্রমান্বয়ে শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ শামসুদ্দিন মুহাম্মদ ইসহাক, জনাব জামাল উদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক ফয়েজুল ইসলাম চৌধুরী, জনাব আখতারুজ্জামান সিদ্দিকী, সাবেক সিজিএ জনাব মোহাম্মদ আবুল কাশেম, অনুজ অধ্যাপক সৈয়দ করিম শতবর্ষের প্রতিনিধিত্ব কারী কয়েকটি নামমাত্র। এই রত্নপ্রসবিনী গ্রামের একজন অতি সাধারণ মানুষ হিসেবে এই গৌরবের অংশীদার হিসাবে নিজেকে ধন্য মনে করি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ বছরের প্রথম ৫০ বছরের অর্জন নিয়ে কারোই কোন দ্বিমত থাকার কথা নয়। আমাদের জাতীয় জীবনের তিনটি প্রধান ও যুগান্তকারী ঘটনা, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু অনুঘটক নয় প্রধান সমন্বয়কারীর ভুমিকা পালন করেছে নিঃসন্দেহে। স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক ধারায় ক্রমান্বয়ে উৎকর্ষতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সেটি হয়নি। অবকাঠামো নির্মাণ, ছাত্র ছাত্রী ও শিক্ষকদের সংখ্যা বৃদ্ধি এই উৎকর্ষতার মানদণ্ড নয়। দেশের প্রধান, প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য ছাত্র শিক্ষকের অবদানের সমৃদ্ধ এই দেশ ও জাতি। বড়দের কাছে আমাদের দাবিওতো অনেক বেশি। এই বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের প্রায় সবকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে নেতিবাচক খবর ও প্রচারণার সবকিছু সঠিক নয় ধরে নিয়েই বলা যায়, আমাদের যেখানে পৌঁছার কথা আমরা সেখানে পৌঁছাতে পারিনি। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হীরক জয়ন্তী কাকতালীয় হলেও একবিন্দুতে মিলে গেছে। এতো কম মুল্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ উপমহাদেশ সহ পৃথিবীর আর কোন উন্নত দেশে কল্পনাও করা যায় না। শুধুমাত্র গ্রাজুয়েট তৈরি করে সরকারি বেসরকারি চাকরির বাজার ও চাহিদা পূরণ কোন বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হতে পারে না। জাতির মননশীল ভুমি তৈরি করাও প্রতিটি গ্রাজুয়েটের নৈতিক দায়িত্ব। বিশেষ করে যে সমস্ত ভাগ্য বিড়ম্বিত প্রান্তিক জনগণের অর্থে গ্রাজুয়েটদের পুষ্টি, তাঁদের কথা ভুলে যাওয়া আত্মপ্রবঞ্চনার সামিল।

মোহাম্মদ পুর নামের একটি অজপাড়াগাঁ থেকে শতবর্ষ আগে একজন জলিল মিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম ব্যাচে ভর্তি হয়ে শিক্ষার যে মশাল জ্বালিয়ে ছিলেন, সময়ের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অবনমনের দিকে। ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠী পরস্পরকে দোষারোপ না করে প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব টুকু সততা ও দেশপ্রেমের সাথে পালন করেই আমরা আমাদের হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারি।

বিশেষ অনুরোধঃ অনুজ নাসের টিপু, শ্রদ্ধেয় কাশেম ভাই, ছোট ভাই/ বন্ধু হারুনর রশীদ চৌধুরী, যদি সম্ভব হয় আজকের (২ জুলাই ২০২১ এর) প্রথম আলোর ঐতিহাসিক ছবিটি সংরক্ষণের অনুরোধ করছি।

জুলাই ০৪, ২০২১

(লেখক অধ্যাপক শামসুল আনোয়ার জামাল আংকেল চট্টগ্রামের রাউজান থানার রত্নগর্ভা গ্রাম মোহাম্মদপুর গ্রামের কৃতী সন্তান। রাউজান মোহাম্মদপুর স্কুল, চট্টগ্রাম কলেজ এবং সর্বশেষ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। দেশে অধ্যাপনা, প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানীর ব্যবস্থাপক পদে চাকুরি করেন। বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী জামাল আংকেলের কনিষ্টা কন্যা সেগুফতা গুমা বিখ্যাত “রোডস স্কলারশীপ” লাভ করে বর্তমানে বিশ্ববিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স অধ্যয়ন করছেন। লেখক, সংগঠক জামাল চাচা যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নিয়ে বর্তমানে সৃজনশীল লেখালেখি, স্মৃতিলেখা, সমসাময়িক আলোচনা ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত আছেন।)

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here