আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমহোদয়গণ

77
37

সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার শুরুর দিকে শিক্ষক বলতেই ‘বেত হাতে এসেম্বলিতে বা শ্রেণীকক্ষে রাগী একজন ব্যক্তি’, পরে তিনি আস্তে আস্তে মমতাময় বা মমতাময়ী হলেন!
তবু স্কুল পালানোর সময় নিজের সুবিধার্থে তাঁদের সামনে বা বারান্দায় না থাকার জন্য মনের কত না ইচ্ছা! একটু উপরের ক্লাসে উঠে তাঁদের আদর-স্নেহের ছোঁয়া বুঝার আগেই কখন যে পঞ্চম শ্রেণি শেষ হয়ে গেল, কত দ্রুত!

মনে পড়ে, আমার শিক্ষার সুঁতিকাগার রাউজান আর্যমৈত্রেয় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সম্মানীয় শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মরহুম শামসু স্যার, সুকুমার স্যার, মরহুম মৌলানা আব্দল বারী র., গীতা ম্যাডাম, রতন স্যার, মনা স্যারসহ এ মুহূর্তে মনে না আসা আমার সেই শিক্ষকমন্ডলীকে, যাঁরা প্রযুক্তি-দুর্বল সে সময়ে, বৈদ্যুতিক পাখাহীন টিনের ছাদের, ইট-বেড়ার বেষ্টনীর সে অপ্রতিকূল অবকাঠামোয় আমাদের শিক্ষাদানে রত ছিলেন।

তবে প্রাইমারি স্কুলে পড়াকালীন সময়েই অভিষেক হয়েছে মক্তবে পড়ার, সে সময় সূর্য ওঠার আগেই মক্তবে পৌঁছাতে হতো, সে এক কঠিন নিয়মানুবর্তিতায়। হাফেজ আহমেদ হুজুর (বাঁশখালি), ফেনির হুজুর, ইসহাক হুজুর সহ অনেকেই আমাদের কোরআন শিক্ষা, নামাজ সহ শরীয়তের মৌলিক বিষয়গুলো
শিক্ষা দিতেন আদর-শাসন মেশানো অনন্য পদ্ধতিতে। শ্রদ্ধার সাথে তাঁদের স্মরণ করছি।

মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকমহোদয়গণের স্মৃতি অনেকটা স্পষ্ট; প্রধান শিক্ষক বাবু অনিল দাশ, স্বপন স্যার, সন্তোষ স্যার, নুরুল আলম স্যার,মৌলানা আব্দুস সালাম হুজুর, নাজিমুল হোসাইন হিরু স্যার, জ্যোতিষ স্যার, শাহ আলম স্যার, আলতাফ স্যার, নুরুল ইসলাম স্যার, ইসহাক হুজুর, ফিরোজ স্যার, মহসিন স্যার, মনসুর স্যার,হেলাল স্যার প্রমুখ স্যারদের সাথে ভূমিকা স্মৃতির পাতায় গেঁথে আছে এখনো।

বিশেষ করে, স্বপন স্যারের ইংরেজীসহ বহুমুখী প্রতিভা সত্যিই বিরল,তেমনি বিখ্যাত সন্তোষ স্যারের বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজী, অঙ্ক, হিসাববিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা মনে করিয়ে দেয়, স্যারদের জ্ঞানের গভীরতা ও আমাদের অজ্ঞতা! আবার তাঁদের পাঠদান ছিল রসবোধ ও গম্ভীরতার অনন্য মিশ্রণ।

স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী পরিষদের বিভিন্ন অনুষ্টানে বিদ্যালয়ে যাওয়া হয়, তখনকার সময়ের কয়েকজন স্যার এখনো আছেন, বসতে বলে, কিন্তু সাহস হয়ে উঠেনা। সে ভয়ে, বয়ঃকালেও হয়ত কখনো শিক্ষক দিবসের শুভেচ্ছা জানানো হবে না, কিংবা কখনো হয়ত বলাও হবেনা, কতটুকু ভালবাসা আর শ্রদ্ধার বেদিতে তাহারা বর্তমান। এখানেই হয়ত আজকের ছাত্রদের সাথে আমাদের ফারাক, আমাদের পিছনে অবস্থান। আর স্বপন স্যার, ইসহাক হুজুর সহ বেশ কয়েকজন ইতিমধ্যে ইহধাম ত্যাগ করেছেন, বাকিদের খবর কতইবা রাখি?

উচ্চ মাধ্যমিকে রাউজান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে সেই ১৯৯৭-১৯৯৮ সেশনে পড়াকালীন অনেক শিক্ষক এখন অবসরে, অর্থনীতির ‘রসিক’ রশিদ স্যার ছিলেন অধ্যক্ষ। তৎকালীন অধ্যক্ষ আহমদ হোসেন স্যার, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চিত্ত রঞ্জন স্যার, অর্থনীতির মৃদুল স্যার, হিসাববিজ্ঞানী রুদ্র স্যারসহ বেশ কয়েকজন স্যার এখন না ফেরার দেশে। মনে পড়ে বাণিজ্য বিভাগের দিদারুল আলম স্যার, সাইফুল হক স্যার, সেলিম নওয়াজ স্যার, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মনোয়ারা ম্যাডাম, ইংরেজীর মোনাব্বের স্যারের সাথে যোগাযোগের সুযোগ হয় না অনেকদিন;
ইংরেজি বিভাগের প্রিয় খালেদ বিন চৌধুরী স্যার বর্তমানে বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির প্রধান, এখনো স্নেহের বাঁধনে রাখেন; বাংলার আনন্দ মোহন স্যার, সরোজ স্যার, বিজ্ঞানের বীরেন স্যার, ইসলামের ইতিহাসের একেএম ইসলাম স্যার প্রমুখ। কলেজে উচ্চ শিক্ষায় পড়লেও আমাদের সম্মানীয় স্যারদের সামনে আমাদের ছিল ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধার দূরত্ব ছিল বেশী যা হয়ত আজকের স্মার্ট ছাত্রদের কাছে বেমানান, কিন্তু আন্তরিকতা ও নৈকট্যের উদাহরণ অশেষ; এখনো স্যারেরা আমাদের চিনলে ডেকে কাছে টেনে নেয়, সময়ের বিবর্তনে জুনিয়রদেরকে আমাদের সময়কার কথা বলেন।

যে কোন রাজনৈতিক আবহে এখনো পোস্টার-চিকার নোংরামিমুক্ত আমার দেখা পরিচ্ছন্ন কলেজটিতে ছিল তখন বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর কলেজগুলোর একটি; এখন অনার্সও পড়ানো হয়, সরকার চাইলে সরকারিও হবে। কিন্তু সে আলমা মেটারের খবর রাখার ফুসরত আমরা পাই কম!

চ্ট্টগ্রাম কলেজে ইংরেজী সম্মান শ্রেণীতে ভর্তির সময় ছাত্র হিসেবে সাবালক, কিন্তু বিদেশী ভাষার সাহিত্যপঠন গ্রামের কলেজ থেকে আসা শিক্ষার্থীে জন্য সুকঠিন ছিল বৈ কী! আর সে প্রথম ধাক্কা সামাল দিলাম সম্মানিত স্যারদের সহজ-সাবলীল পাঠ-দান কৌশলে, যাঁরা আমাদের মাঝে এ বিশ্বাস গৃথিত করলেন, Man can be destroyed, but not defeated.
Still remember glorious memory of Professor SC Paul sir, Prof. Shamsuzzaman sir, prof A. moktadir Sir, Prof. Shahidullah sir, prof. Shaswati Madam, Prof. Syed Nazim Sir, Ajit Sir, Prof. Abul Hasan Sir, Prof dr Golam Faruk sir, Nasrin madam, Quium Nizami Sir,
Rizwan Sir, Arif Elahi Sir, Saiful Sir, Tawarik sir, Fatema Ma’am etc.
সাবসিডিয়ারী বিষয়গুলো সহজ করে দিতেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এনাম স্যার, মুস্তফা কামরুল স্যার, শিপ্র ম্যাডাম, ইতিহাসের ইকবাল স্যার, আলমগীর স্যার প্রমুখ।
যে শিক্ষকগণ অন্ধকার প্রহরসমূহে মনে আলো জ্বালানোর চ্যালেঞ্জটি হাতে নিয়েছিলেন সেই অবলা সময়গুলোতে, পথহারা পথিকের মত ভবঘুরেকে পথের দিক দেখিয়েছেন, সে পথের বৈষিয়িক ইঙ্গিত পেয়েই আমরা ভুলতে বসেছি সেই দিকপালদের। ইউএসটিসির এমবিএ ফ্যাকাল্টির শিক্ষকগণের স্মৃতি সবচেয়ে সতেজ। তবে আইন কলেজে ক্লাসে অতিরিক্ত অনুপস্থিতি এখনো দুঃখভরা স্মৃতি নিয়ে অাসে।
নিজেদের নিয়ে কতইনা ব্যস্ত আমরা?

সময়ের বিবর্তনে আজ সময় হয়েছে ভাবার, আমার, আপনার সবার। আপনি আমি কোথায়, কি করি, ভাল আছি কি না, সেটিই তিনি জানতে চান,
আমি ভাল আছি, সেটি শুনেই তৃপ্ত হন,
আমি আপনি ভাল জায়গায় আছি, সেটি গর্বভরে অন্যকে বলেই যিনি পরিতৃপ্ত,
তিনি শ্রদ্ধেয় সম্মানিত শিক্ষক।

আজ এই ক্ষণে প্রয়াত শিক্ষকমন্ডলীর আত্মার মাগফেরাত কামনা করি,
যাঁরা বেঁচে আছেন, তাদের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি, তাদের দেয়া জ্ঞানের শিখায় নিজেদের আলোকিত করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছি।

মোঃ নাজিম উদ্দিন
nazim3852@gmail.com
০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬

77 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here